টাকার গাছ Strategy: নিয়মিত SIP, Market Drawdown-এ Extra Investment ও Profit Booking
আসুন আজকে আমরা কথা বলি, আমাদের সবচেয়ে প্রিয় একটা স্ট্রাটেজি নিয়ে, যার নাম আমরা রেখেছি — "টাকার গাছ"।
ছোটবেলায় আমরা অনেকেই বাড়ির উঠোনে একটা চারাগাছ লাগিয়েছি নিজের হাতে। মাটি খুঁড়ে বসিয়ে দিয়েছি চারাটা, তারপর রোজ সকালে একটু একটু করে জল দিয়েছি গোড়ায়, কখনও সখনও দিয়েছি সামান্য জৈব সার। সেই গাছে ফল আসার আগে যখন নতুন পাতা গজাতো, তখনও এক অনাবিল সৃষ্টিসুখের আনন্দ আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে দিত। কিন্তু গ্রীষ্মকাল এলে ছবিটা পাল্টে যায় — রোদের তাপে মাটি ফেটে চৌচির হওয়ার জোগাড়, আমাদের প্রিয় গাছটি কেমন যেন নুইয়ে পড়ছে, আমাদের অন্তর আকুল, মন খারাপ দেখে বাড়ির কোনো বড় ব্যক্তি আমাদের যুক্তি দেন, এখন আর শুধু আগের মতো একই পরিমাণে জল দিলে হবে না, দরকার আরেকটু বেশি যত্নের। তখন আমরা জল-সার দেওয়ার পরিমাণটা আরেকটু বাড়িয়ে দিই, যাতে গাছটা এই কঠিন সময়টা টিকে থাকতে পারে, শিকড়টা আরও গভীরে গিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরতে পারে। সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আসতো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, কড়ি-ফুল-ফল। আহঃ! কি আনন্দ!
ঠিক এই ছবিটা থেকেই জন্ম "টাকার গাছ" স্ট্রাটেজির। আর এই গাছ আমরা লাগাই মূলত বোর্ডার ইনডেক্স-বেসড ETF-এ — অর্থাৎ যেসব ETF গোটা বাজারের একটা বড়সড় অংশকে সঙ্গে নিয়ে চলে।
চলুন, তিনটে ধাপে গল্পটা পুরো বুঝে নিই।
১. চারা বসানো আর নিয়মিত পরিচর্যা
- যেকোনো গাছের গল্প শুরু হয় একটা বীজ দিয়ে।
- প্রথম দিনেই আমরা ₹১০,০০০ ঢেলে দিই মাটিতে, স্ট্রাটেজি শুরু হয় এখান থেকে।
- এরপর প্রতি সপ্তাহে ₹১,০০০ করে SIP চলতেই থাকে, থামে না।
- এই টাকা যায় সপ্তাহের শেষ ট্রেডিং দিনে (সাধারণত শুক্রবার)। শুক্রবার ছুটি থাকলে বৃহস্পতিবার, সেটাও না হলে তার ঠিক আগের ট্রেডিং দিন।
- ETF কেনা হয় শুধু গোটা ইউনিটে, ভাঙা টুকরোয় নয়। তাই মাঝেমধ্যে সামান্য কিছু টাকা বিনিয়োগ না হয়ে থেকে যেতে পারে — এটা একদম স্বাভাবিক, চিন্তার কিছু নেই।
এটাই আমাদের গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেই জল-সার দেওয়ার মতো।
২. গ্রীষ্মের সময় বাড়তি যত্ন
বাজার যখন হুট করে নামতে শুরু করে, অর্থাৎ ড্রডাউন আসে, সেটাই যেন গাছের জন্য কাঠফাটা গ্রীষ্মকাল। ঠিক তখনই আসল পরীক্ষা শুরু, আর তখনই দরকার বাড়তি যত্নের, অর্থাৎ অতিরিক্ত বিনিয়োগের।
আমরা নিয়মটা বেঁধেছি এভাবে:
- প্রতি ২% ড্রডাউনে সাপ্তাহিক SIP-তে বাড়তি ₹২০০ যোগ হয়ে যায়।
- এভাবে বাড়তি SIP হতে পারে সর্বোচ্চ ₹৩,০০০ পর্যন্ত।
অর্থাৎ মোট সাপ্তাহিক SIP সর্বোচ্চ ₹৪,০০০-এ (₹১,০০০ বেস + ₹৩,০০০ বাড়তি) গিয়ে ঠেকতে পারে।
হিসেবটা দাঁড়ায় এমন:
- ০% ড্রডাউনে SIP ₹১,০০০
- ২% ড্রডাউনে SIP ₹১,২০০
- ৪% ড্রডাউনে SIP ₹১,৪০০
- ৬% ড্রডাউনে SIP ₹১,৬০০
...এভাবে চড়তে চড়তে সর্বোচ্চ ₹৪,০০০
বাজার যত নামে, আমরা তত বেশি ইউনিট কিনে নিই — ঠিক যেমন গ্রীষ্মের রুক্ষ দিনগুলোতে গাছে বাড়তি জল-সার দিয়ে যত্ন নিই, যাতে শিকড়টা আরও মজবুত হয়ে ওঠে।
৩. ফল পাকলে তা পেড়ে নেওয়া, তবু গাছটা রয়ে যায় আগের মতোই
পোর্টফোলিওর ভ্যালু যখন Base Investment + একটা নির্দিষ্ট প্রফিট টার্গেটে (এই টার্গেটটা আমরা যে গুগলশীট তৈরি করেছি তার একটা সেল, K5-তে বসিয়ে রাখি, যাতে চাইলেই বদলে নেওয়া যায়) গিয়ে ঠেকে, তখন আমরা প্রফিট বুক করি। কিছু ইউনিট বিক্রি করে দিই, ঠিক ততটাই, যাতে টার্গেট অ্যামাউন্টের কাছাকাছি টাকা হাতে আসে।
এখানে কয়েকটা জিনিস আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন রেখেছি:
- বিক্রির পরেও Base Investment কমানো হয় না। অর্থাৎ গাছ আমাদের একই থাকে।
- ফলে Average Price প্রতিবার প্রফিট বুকিংয়ের পর বেড়ে যায় — এটা কোনো ভুল হিসেব নয়, বরং স্ট্রাটেজিরই একটা অংশ, ইচ্ছে করেই রাখা।
- আর যে টাকাটা প্রফিট হিসেবে তুলে নেওয়া হলো, সেটা বাইরে বের করে আনা হয় না। পুরোটাই থেকে যায় পোর্টফোলিওর ভেতরে, যেটা ড্রডাউনের সময় অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা হয়।
একজন পুরনো বিনিয়োগকারী প্রায়ই বলতেন, ধৈর্য আর নিয়মানুবর্তীতা মিলিয়েই আসল সম্পদ তৈরি হয়, তাড়াহুড়ো করে নয়। "টাকার গাছ"ও ঠিক সেই ভাবনাতেই বোনা — তাড়াহুড়ো নেই, শুধু নিয়ম মেনে চলা আর অপেক্ষা। ফলত আমাদের গাছ ক্রমশ বড়ো হতে থাকবে, বেশি বেশি ফল দিতে থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে একটা বড় কর্পাস তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে MIS, SCSS বা SWP-র মতো কোনো স্কিমে রেখে নিয়মিত আয়ের একটা পথ তৈরি করে দিতে পারে।
এই স্ট্রাটেজিতে আমরা এককালীন টাকা বিনিয়োগ করি না, প্রতি সপ্তাহে করি। তাই রিটার্ন মাপার জন্যও সাধারণ হিসেব চলে না, আমরা ব্যবহার করি XIRR পদ্ধতি। XIRR হিসেব করার সময়ও আমরা একটা জিনিস মাথায় রাখি — শুধু আমাদের নিজেদের পকেট থেকে যাওয়া টাকাটাই (প্রাথমিক ₹১০,০০০ + প্রতি সপ্তাহের বেস SIP ₹১,০০০) আর শেষে পোর্টফোলিওর বর্তমান ভ্যালুটাই হিসেবের মধ্যে ধরা হয়। প্রফিট বুকিংয়ের টাকা যেহেতু আবার ভেতরেই ফিরে যাচ্ছে, সেটা আলাদা করে যোগ করা হয় না।
এভাবেই আমাদের "টাকার গাছ" একটু একটু করে ডালপালা মেলে বড় হতে থাকে — নিয়মিত জল-সার প্রয়োগ, গ্রীষ্মের দিনে বাড়তি যত্ন, আর সময়মতো ফল পেড়ে নেওয়া, তবু গাছটি থাকে একই রকম প্রাণবন্ত, চিরসবুজ; ক্রমবর্ধমান, সদা ফলদায়ী।
হিসেব রাখার খাতা
একটা গাছের যত্ন আধুনিক বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিতে গেলে, যেমন কবে জল দিলাম, সার দিলাম, কবে ফল পাড়লাম — এসবের একটা হিসেব লিখে রাখা উচিত, ঠিক তেমনই এই স্ট্রাটেজি ট্র্যাক করার জন্য আমরা বানিয়েছি একটা গুগলশীট। সাথে আছে আলাদা একটা ব্যাকটেস্ট শীটও, যেখানে অতীতের ডেটা দিয়ে দেখা যায় স্ট্রাটেজিটা এতদিনে কেমন ফল দিত।
শীটটা পেতে আগ্রহী হলে, ETF Bangla School ফেসবুক পেজ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে পারেন।
আপনার কাছে যদি এই স্ট্রাটেজিটা ভালো লেগে থাকে, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দিন। আর কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে কমেন্টে বা মেসেজে জানাতে ভুলবেন না — আমরা একসাথেই তো শিখছি।
(দ্রষ্টব্য: এটি একটি বিনিয়োগ পদ্ধতির ব্যাখ্যা মাত্র, কোনো নিশ্চিত রিটার্নের প্রতিশ্রুতি নয়। বাজার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিজের বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করুন।)

ইটিএফ বাংলা একটি পার্সোনাল ফাইনান্স এর শিক্ষা মূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url